ডিজাইন: ইমেজ চালু
রবিবার ১৯ এপ্রিল ২০২৬

দৈনিক সময়কাল

শব্দদূষণে থমকে যাওয়া রাত: আমাদের উল্লাস কি অন্যের দীর্ঘশ্বাস?


খন্দকার বদিউজ্জামান বুলবুল:- দেখতে দেখতে আরেকটি বছরের পরিসমাপ্তি। আর মাত্র কয়েকটি দিন এরপরই আমাদের মাঝে হাজির হবে নতুন বছর। নতুন বছরে মানুষের আশার পারদ আকাশচুম্বী। এক বুক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে উৎসবের আমেজে মজে যাবে গোটা দেশ।  বর্ষবরণের উৎসবে বাদ যাবে না তরুণ প্রজন্ম। তবে দেশে সম্প্রতি বছরগুলোতে বর্ষবরণের যে ট্রেন্ড চালু হয়েছে তা এক কথায় ভয়াবহ। ঘড়ির কাটায় রাত ১২.০১ মিনিট বাজার সাথে সাথে আতশবাজি'র বিকট শব্দে আশপাশের পরিবেশ প্রকম্পিত হয়। যা প্রায় সারা রাত জুড়ে চলতে থাকে। বর্ষ বরনের এমন আয়োজন সাধারণ মানুষের জন্য এক ভয়াবহ আতঙ্কের সৃষ্টি করে। 

নগর জুড়ে যখন আতশবাজি'র বিকট আওয়াজে ইংরেজি নতুন বছর কে বরণ করে নেওয়া হয় ঠিক সেই সময় উল্টো চিত্রও দেখা যায়। শহরের একপাশে যখন বর্ণিল আলোকসজ্জা ও বিকট শব্দে বর্ষ বরনে নগরবাসী ব্যাস্ত থাকে তখন অন্যপাশে ছিন্নমূল মানুষগুলো শীতে একপাশে জুবুথুবু হয়ে রাত্রিযাপন করে। তাদের মাঝে সারারাত এক ভয়াবহ আতঙ্ক ও নিস্তব্ধতা বিরাজ করে। বিকট শব্দে ও আতশবাজির আলোয় শহরের দালান-কোঠায় কিংবা গাছের ডালে বিশ্রাম নেওয়া পাখিরা আতঙ্কিত হয়ে দিকভ্রান্ত হয়ে এদিক সেদিক ছুটোছুটি করে। মধ্যরাতে যুদ্ধের ন্যায় বিকট শব্দ ও আতশবাজির আগুনের ফুলকিতে  অনেক পাখ-পাখালি প্রাণ হারায়। এছাড়াও কুকুর ও বিড়াল আতঙ্কিত হয়ে ছুটোছুটি করতে গিয়ে গাড়ির চাপায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারায়। যা অতন্ত্য হৃদয়বিদারক। এহা শুধু প্রাণীর ক্ষতি করে না বরং মানুষের উপর ফেলে বিরূপ প্রভাব। 

মানুষের সহনীয় শব্দের মাত্রা সাধারণত ৪৫-৫০ ডেসিবল। কিন্তু থার্টি ফার্স্ট নাইটে যে হাই-ফ্রিকোয়েন্সির পটকা বা বাজি ফোটানো হয়, তার মাত্রা ৯০ থেকে ১২০ ডেসিবল ছাড়িয়ে যায়। পরিসংখ্যান বলছে, এই রাতে হৃদরোগীদের হাসপাতালে ভর্তির হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে, নবজাতক শিশুদের জন্য এটি এক বড় ট্রমা। ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাতে আতশবাজির বিকট শব্দে অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছিল চার মাস বয়সি শিশু তানজিম উমায়ের। ২০২৬-কে স্বাগত জানাতে গিয়ে আমরা আর কোন মায়ের বুক খালি করতে চাই না। এ রাতে অন্যান্যদের মতো বয়স্ক ও শিশুরাও পড়ে চরম বেকায়দায়। যাদের হৃদরোগ ও শ্বাসকষ্ট বা উচ্চ রক্তচাপ আছে তাদের জন্য এই রাত একটি দীর্ঘশ্বাস। আতশবাজির ধোঁয়ায় বাতাসে সালফার ডাই-অক্সাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা এজমা রোগীদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে। এছাড়া এ রাতে ফানুস উড়ানো হয়, যা মোটেও নিরাপদ নয়। বরং ফানুশের আগুনে গাছপালা কিংবা খড়কুটো বা বস্তিতে আগ্নিকান্ডের সূত্রপাত ঘটতে পারে। ২০২২ সালের থার্টি ফার্স্ট নাইটে আতশবাজি ও ফানুস থেকে প্রায় একশ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। সেসব অগ্নিকাণ্ডে নতুন বছরের শুরুতেই বিপুল ক্ষতি হয়।

দূঃখের বিষয় হলো ক্ষণিকের আনন্দের জন্য আমরা আমাদের দেশের প্রচলিত আইন ভঙ্গ করছি ও মামুষকে কষ্ট দিচ্ছি এ বিষয়ে আমরা কেউ ভ্রুক্ষেপ করি না। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের জানতে হবে যে, ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬’ অনুযায়ী অননুমোদিতভাবে আতশবাজি ও পটকা ফোটানো দণ্ডনীয় অপরাধ। এই আইন অমান্য করলে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। অথচ প্রশাসন এ বিষয়ে তেমন কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। নতুন বছরকে আমরা অবশ্যই বরণ করে নিবো তবে সেটা আইনসিদ্ধ পথে। জনগণের ভোগান্তি কিংবা প্রাণীর মৃত্যু হয় এমন উপায় পরিহার করে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশে আমরা নতুন বছরকে বরন করে নিবো। সেই সাথে প্রশাসনকে কেবল প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সীমাবদ্ধ না থেকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। থার্টি ফার্স্ট নাইটের আগেই অবৈধ আতশবাজি বিক্রি ও মজুদ বন্ধে অভিযান চালানো জরুরি। পাশাপাশি জনসাধারণকে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে। যাতে  আমাদের উৎসব অন্যের দীর্ঘশ্বাসে পরিণত না হয়। 

প্রেরকঃ-
খন্দকার বদিউজ্জামান বুলবুল 
শিক্ষার্থী, আনন্দ মোহন কলেজ, ময়মনসিংহ